৩৭৫ বছর পর আবিষ্কৃত হল অষ্টম মহাদেশ জিল্যান্ডিয়া!

আবিষ্কার ১৭ ফেব্রু. ২০২১ Contributor
জ্ঞান-বিজ্ঞান
মহাদেশ জিল্যান্ডিয়া

এতদিন অব্দি আমরা জানতাম পৃথিবীতে মোট মহাদেশের সংখ্যা ৭। কিন্তু এবার খোঁজ পাওয়া গেল অষ্টম মহাদেশ জিল্যান্ডিয়া-র। মানুষ অজানার খোঁজে, নতুন আবিষ্কারের খোঁজে বরাবরই উৎসুক, আর তাই জানার ইচ্ছে অন্তহীন। ১৬৪২ খ্রিস্টাব্দে আবেল তাসমান নামের এক অভিজ্ঞ ওলন্দাজ নাবিক দুটি ছোট জাহাজে করে পাড়ি দিয়েছিলেন অজানার উদ্দেশ্যে, নতুন দেশ আবিষ্কারের খোঁজে। পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর শেষে দক্ষিণে যাত্রা করে তিনি পৌঁছন নিউ জিল্যান্ডের দক্ষিণতম দ্বীপে। পথিমধ্যে জাহাজের সহনাবিকদের বিদ্রোহ থেকে শুরু করে সামলেছিলেন অনেক ঝঞ্ঝা।

নিউজিল্যান্ডের স্থানীয় মাওরি সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের জাহাজে হামলা করে একটিকে ধ্বংস এবং অনেক নাবিককে হত্যাও করে। তাসমান সেই দ্বীপ অঞ্চলকে হত্যাকারীর খাঁড়ি (Murderers Bay) নাম দিয়ে ফেরত আসেন। তার ঠিক ৩৭৫ বছর পর জানা গেল নিউজিল্যান্ডের সেই অংশ আদতে একটি আলাদা মহাদেশের অংশ, যাকে অনেক অনেক কাল আগে নাম দেয়া হয়েছিল টেরা অস্ট্রেলি (Terra Australis) এবং বর্তমানে আবিস্কারক গণ যার নাম দিয়েছেন জিল্যান্ডিয়া (Zealandia)।

কীভাবে পাওয়া গেল এই অষ্টম মহাদেশ জিল্যান্ডিয়ার খোঁজ?

আবেল তাসমানের পরে অনেক অনেক অভিযান হয়েছেন নতুন দেশ আবিষ্কারের পথে। সেইরকমই তাসমানের যাত্রার ১০০ বছর পর ইংরেজ মানচিত্র প্রস্তুতকারক অভিযাত্রী জেমস কুককে একটি গোপন অভিযানে পাঠানো হয় সুদূর দক্ষিণে নতুন স্থলভাগের খোঁজে এবং বিশ্বাস করা হয় তিনি পৌঁছেওছিলেন সেখানে। তবে প্রকৃতপক্ষে জিল্যান্ডিয়ার সম্পর্কে ভূতাত্বিক প্রমাণ প্রথম পাওয়া যায় স্কটিশ প্রকৃতিবিদ স্যার জেম্স হেক্টরের লিপিতে যিনি ১৮৯৫ সালে নিউ জিল্যান্ডের দক্ষিণের দ্বীপ গুলিকে নিয়ে সার্ভে করেছিলেন।

তিনি উল্লেখ করে গেছেন নিউ জিল্যান্ড সম্ভবতঃ কোনো একটি পাথুরে স্থলভাগের সমষ্টির একটি অংশ। তবে ১৯৬০ সাল অব্দি তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো কাজের প্রমাণ পাওয়া যায় না। এরপর ২০১৭ সালে নিউ জিল্যান্ডেরCrown Research Institute GNS Science প্রতিষ্ঠানের একদল ভূতত্ববিদ অনেক গবেষণার পর জানান যে পাওয়া গেছে সেই অষ্টম মহাদেশ জিল্যান্ডিয়া, স্থানীয় মাওরি ভাষায় যার নাম Te Riu-a-Māui। আয়তনে ৪৯ লক্ষ বর্গ কিমির এই মহাদেশের ৯৪% শতাংশই জলের তলায়, বলা ভাল জলের ২ কিমি নীচে।

কীভাবে তৈরী হয়েছিল মহাদেশ জিল্যান্ডিয়া?

মনে করা হয় জিল্যান্ডিয়া আজ থেকে ৫৫ কোটি বছর আগে প্রাচীন গন্ডোয়ানাল্যান্ডের অংশ ছিল। এই গবেষণার সাথে যুক্ত ভূতত্ববিদ এন্ডি টুলক জানান, “১৫ কোটি বছর আগে জিল্যান্ডিয়া গন্ডোয়ানাল্যান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে, যদিও তার কারণ আমাদের কাছে এখনো অজানা। ” সাধারণতঃ কোনো মহাদেশের ভূত্বকের গভীরতা গড়ে ৪০ কিমি মত হয়ে থাকে। কিন্তু গন্ডোয়ানাল্যান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হবার সময় প্রচন্ড টানের ফলে জিল্যান্ডিয়ার ভূত্বকের গভীরতা কমতে কমতে ২০ কিমির থেকেও কমে যায় এবং স্বাভাবিকভাবেই তা জলের তলায় চলে যায়।

৯৪% জলের তলায় থাকলেও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এবং অস্ট্রেলিয়ান টেকটোনিক প্লেটের ধাক্কায় কিছু অংশ জলের উপরে উঠে শৈলশিরা বা বলা যায় প্রাকৃতিক সেতুবন্ধের আকার নিয়েছে। এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি যেমন, এত পাতলা একটি মহাদেশ এতদিনে জল এবং টেকটোনিক প্লেটের ধাক্কায় পুরো চূর্ন-বিচূর্ণ হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিচ্ছিন্ন মহাদেশে পরিণত না হয়ে টিকে আছে কীভাবে? তবে জিল্যান্ডিয়ায় প্রাপ্ত সমস্ত ধরণের পাথর এবং ভূতাত্বিক বৈশিষ্ট্য এটিকে একটি আলাদা মহাদেশ হিসেবেই প্রমাণ করে। আপাতত সেখানে পাওয়া বিভিন্ন জীবাশ্ম নিয়ে গবেষণা পুরোদমে চলছে।