৬০০ বছরের প্রাচীন বিস্মৃত ইতিহাস বুকে নিয়ে বেঁচে রয়েছে লিথুয়ানিয়ার এই গ্রাম

lithuania village

লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াস থেকে গাড়ি চালিয়ে ২০ মিনিট উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ৬০০ বছরের পুরনো এক গ্রাম কেটুরিয়াসদেসিমট তোতোরিউ (Keturiasdesimt Totoriu)। অনুবাদ করলে হয়, চল্লিশ তাতারের গ্রাম। 

একটেরে গ্রাম, নিরিবিলি। পোষা মুরগিরা খুঁটে-খুঁটে দানাপানি খাচ্ছে। পাহারাদার কুকুর একবার ভারী স্বরে ডেকে উঠল শুধু। এছাড়া শান্ত নিস্তব্ধ গ্রামটায় সিলভার বার্চ গাছের পাতার মড়মড় ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। বাসস্টপে একটা ক্লান্ত কংক্রিটের বেঞ্চ ছাড়া কিছুই নেই। এই অদ্ভুত সুন্দর শান্ত একা গ্রামটি আসলে বাল্টিক তাতারদের। যাদের বলা হয় ইউরোপের প্রাচীনতম মুসলমান সম্প্রদায়। 

নির্জন গ্রামে স্বমহিমায় উজ্জ্বল একটি মসজিদ, কিন্তু অন্যান্য মসজিদের সঙ্গে তার আকার ও প্রকারের কোনও মিল নেই। গ্রামের অধিবাসীদের মতে, তাদের ভাষা, পরিচয় অনেকাংশেই মিশে গিয়েছে ইউরোপের অন্যান্য জনজাতির সঙ্গে, কিন্তু অনন্য হয়ে রয়েছে একমাত্র এই মসজিদটি। 

চৌকো আকৃতির বাদামি রঙের এই মসজিদটি কাঠের তৈরি। ছোট আকৃতির জানলা সমন্বিত এই মসজিদের ছাদটি টিনের, ছাদের উপর ছোট আকৃতির গম্বুজ রয়েছে।  এক ঝলকে দেখলে মনে হবে সোভিয়েত দেশের বহু প্রাচীন কোনও চার্চ, তবে ক্রুসিফিকশের জায়গায় চাঁদ দেখলে বোঝা যায় স্থাপত্যটি আসলে মসজিদ।

কথিত আছে, ইসলাম ধর্মাবলম্বি তাতাররা মোট ৬০টি মসজিদ স্থাপন করেছিল। তার মধ্যে ২৪টি লিথুয়ানিয়ায়। বর্তমানে মাত্র ৪টি মসজিদ অটুট রয়েছে, চল্লিশ তাতারের গ্রামের মসজিদটি তার মধ্যে প্রাচীনতম। ১৫৫৮ শতকে এই মসজিদ স্থাপিত হয়। 

যদি ইতিহাসের পথ ধরে চতুর্দশ শতকে ফিরে যাই তাহলে দেখব বাল্টিকের এই অংশটি গ্র্যান্ড ডাচি অফ লিথুয়ানিয়া নামে পরিচিত ছিল। এইসময় এই অঞ্চল ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক ক্ষমতার রেষারেষির মাঝে পড়ে গিয়েছিল। পশ্চিম ও দক্ষিণ ইউরোপে তখন রক্তক্ষয়ী ক্রুসেড চলছে। পূর্বে তুর্কী মুসলমানরা তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। এর মধ্যে গ্র্যান্ড ডুচি যেন শান্ত সমাহিত হয়ে ভারসাম্য বজায় রাখছিল।

তৎকালীন শাসক, গ্র্যান্ড ডিউক গেডিমিনাস (১২৭৫-১৩৪১) ফরমান জারি করেছিলেন, তাঁর শাসনকালে খ্রিস্টানরা তাদের মতো করে উপাসনা করবে, রাশিয়ানরা তাদের মতো করে ও আমরা মুসলমানরা আমাদের মতো করে। তিনি মনে করতেন ঈশ্বর উপাসনায় কোনও সংঘাত থাকতে পারে না। 

যদিও জার্মানিক খ্রিস্টানদের বহুদিন থেকেই লোলুপ দৃষ্টি ছিল গ্র্যান্ড ডাচির উপর। তারা চেয়েছিল এই অঞ্চলের সমগ্র জনজাতিকে খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে। সেই উদ্দেশ্যেই যখন তারা আক্রমণ করে তখন গ্র্যান্ড ডিউক ওয়াতাউতাস ৩০০০ মুসলমানকে নিয়ে এক সৈন্যদল তৈরি করে ক্রুসেডারদের হঠিয়ে দেন। এই সৈন্যদলের অর্ধেকের বেশি ছিল তাতার জনজাতি। 

অতঃপর, ১৩৯৮ শতকে গ্র্যান্ড ডিউক ওয়াতাউতাসের আহ্বানে তাতার জনজাতি লিথুয়ানিয়ায় বসবাস করতে শুরু করে। তাতাররা আদতে ক্রিমিয়ায় বাস করলেও তাদের পূর্বপুরুষের সঙ্গে মোঙ্গোলদের যোগ থাকায় তারা ছিল দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। ওয়াতাউতাস ক্রুসেডার ও নাইটদের থেকে যেকোনও সময় আক্রমণের আশংকা করছিলেন, তাই নিজের রাজধানী ত্রাকাইয়ের কাছাকাছি তিনি তাতারদের থাকার অনুমতি দেন।

এভাবেই গড়ে ওঠে তাতার গ্রামগুলো ও মসজিদ। 

চল্লিশ তাতারের গ্রামের নামের ইতিহাস বলে, প্রথমে ওখানে চল্লিশটি তাতার পরিবার এসে বসবাস করতে শুরু করেছিল। তারপর আস্তে-আস্তে গ্রামের আয়তন বাড়তে থাকে। এখনও গ্রামের রাস্তা সাতশো বছরের পুরনো স্মৃতির ঝলক দেখায়। 

এই গ্রামের মানুষদের পূর্বপুরুষরা ১৪১০-এর গ্রুনওয়াল্ডের যুদ্ধে ক্রুসেডারদের নির্মমভাবে পরাজিত করেছিল। খ্রিস্টান নাইটরা তারপর এই অঞ্চল আর বিশেষ আক্রমণ করতে সাহস পায়নি। 

ওয়াতাউতাস প্রদত্ত জমি ও গ্রামের সীমানা ছিল ত্রাকাইয়ের দক্ষিণ থেকে পশ্চিমের বিয়ালস্টোক ও পূর্বে মিনস্ক পর্যন্ত প্রসারিত। ৬০০ বছর ধরে তাতাররা এখানে বসবাস করছে, আর একের পর এক যুদ্ধ জয় করেছেন। তাদের সমাধি রয়েছে এই গ্রামে।

বেশিরভাগ সমাধি এখন শুধু ভাঙাচোরা পাথর মাত্র, কিন্তু যদি খুব খুঁটিয়ে দেখা যায় তাহলে একটি কবরের উপর  ১৬২১ খোদাই করা আছে দেখা যাবে। জনৈক ‘আলহাওয়ার্দি’র কবর সেটি। 

তবে আলহাওয়ার্দির সময় থেকে সময় পাল্টেছে অনেক। বাকি ইসলাম সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় ও রাশিয়ার কমিউনিস্ট প্রভাবে তাতাররা ক্রমশ নিজেদের ধর্ম পালনের আচার আচরণ বিস্মৃত হয়েছে। রয়ে গিয়েছে শুধু ইসলামের মূল সুরটুকু।

গ্রামবাসীদের মতে, আড়াইশো বছর আগেও এই অঞ্চলের মানুষ আরবিক অক্ষর ব্যবহার করত। এখন সেসব অতীত। 

বিংশ শতাব্দীতে ইউএসএসআর বা সোভিয়েত রাশিয়ার অন্তর্গত হওয়ার পর ইসলাম পাকাপাকি নিষিদ্ধ হয়ে যায় এই অঞ্চলে। 

তা সত্ত্বেও ইসলাম বেঁচে ছিল মানুষের হৃদয়ে, ঠিক যেমন বেঁচে রয়েছে এই মসজিদ। 

সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি এই মসজিদের পাইন কাঠের তৈরি মেঝে নারী ও পুরুষের উপাসনার জন্য আলাদা ভাগে ভাগ করা। ফিকে সবুজ জালের পর্দা দিয়ে ঢাকা। বয়স্ক মানুষ যারা হাঁটু মুড়তে পারেন না তাদের জন্য কাষ্ঠাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। মসজিদের মূল অংশ নীল কার্পেট দিয়ে মোড়া। পুরুষদের উপাসনা গৃহে উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার তুর্কী ধাঁচ মনে করায়। 

৬৫ বছর বয়সী  তাতার মহিলা ইভজেনেনিয়া ইয়াকুবাউস্কাইনে কথা অনুসারে, কেউই এখন নমাজ পড়তে জানেনা, তাই শুধু জন্ম ও আকিকা ও মৃত্যু ও জানাজার জন্য এই মসজিদ ব্যবহার করা হয়। এছাড়া ধর্মীয় উৎসব সমস্ত এই মসজিদে হয়। 

৬০০ বছরের প্রাচীন বিস্মৃত ইতিহাস বুকে নিয়ে চুপ করে মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য অপেক্ষা করছে চল্লিশ তাতারের গ্রাম ও তার মসজিদ। 

কীভাবে যাবঃ ভিলিনিয়াস এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি বা বাসে শহরের দক্ষিণে গেলেই পৌঁছনো যাবে। যাওয়ার আগে তাতার মুসলিম অর্গ্যানাইজেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে গেলে অনেককিছু জানা যাবে অবশিষ্ট মসজিদগুলোতেও যাওয়া যাবে। গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কথা বলা যাবে। তবে মাথায় রাখতে হবে, গ্রামটি মূলত টুরিস্ট স্পট নয়, তাই শান্তি ও নেকি বজায় রাখা আমাদের কর্তব্য।